বেকারত্ব, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রমের করোনাকাল

মা অসুস্থ, তাই গরুর ঘাস সংগ্রহ করতে বের হয়েছে নাহিদ হাসান। সে স্থানীয় স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। দিনাজপুর!

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার মাঝাপাড়া গ্রামের মেয়ে আক্তারিনা খাতুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ছেন। গত মার্চে করোনা-বন্ধ শুরু হলে তিনি বাড়িতে চলে আসেন।

তখন থেকে বাড়িতেই আছেন আক্তারিনা। গত ছয় মাসে পড়ালেখা খুব একটা হয়ে ওঠেনি তাঁর। গত জুলাইয়ের গোড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনলাইন ক্লাস চালু করেছে। আক্তারিনা মোবাইল ফোনে নিয়মিত ক্লাস করার চেষ্টা করেন। কিন্তু নেটওয়ার্ক দুর্বল। সব সময় ক্লাসে ঢুকতে পারেন না।

আক্তারিনার বাবা আবেদুর রহমান নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। মা-বাবা, ভাইবোন মিলে চারজনের সংসার। ঢাকায় পড়াশোনার পাশাপাশি দুটি টিউশনি করতেন তিনি। গত দুই মাস বাড়ির পাশের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পড়িয়ে ৫ হাজার টাকা পেয়েছেন। পুরো টাকাই তুলে দিয়েছেন বাবার হাতে।

আক্তারিনার সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয় ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে, মাঝাপাড়া গ্রামে তাঁর বাড়িতে। আগামী অক্টোবরে তাঁর এমএ পাস করে বেরোনোর কথা ছিল। এখন সেশনজটে পড়লেন। এই সংকটকাল কবে শেষ হবে, তা-ও বুঝতে পারছেন না।

হতাশ গলায় আক্তারিনা বলেন, ‘এমনিতেই অভাবের সংসার। বাবা কষ্ট করে টাকা পাঠাতেন। তাঁর ধারণা ছিল, পড়াশোনা শেষ হলে চাকরি হবে। আমিও ঠিক সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।’

আক্তারিনার মতো তাঁর বড় ভাই আখতারুজ্জামানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ থেকে ২০১৮ সালে স্নাতকোত্তর পাস করে তিনি সরকারি চাকরির জন্য পরীক্ষা দিয়ে চলেছেন। ৪১তম বিসিএসসহ ১১টি জায়গায় প্রাথমিক আবেদন করেছেন। কিন্তু নিয়োগের পরীক্ষাগুলো স্থগিত রয়েছে।

গত শনিবার আক্তারুজ্জামানও বাড়িতে ছিলেন। বললেন, করোনাকাল শুরু হলে বাড়িতে চলে আসেন। দেখতে দেখতে ছয় মাস কেটে গেল। চাকরির পরীক্ষা হচ্ছে না। ঢাকায় থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে দলে পড়ালেখার চর্চা ছিল। এখন সবই বন্ধ।

কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তরের দরিদ্র জেলা দিনাজপুরের গ্রাম-শহর ঘুরতে ঘুরতে করোনাকালে অনিশ্চয়তার নানা রকম প্রভাবই দেখা হলো। শেষ যাত্রায় বড় করে নজরে পড়েছে বেকারত্বের ফাঁদে পড়া শিক্ষিত তরুণদের অস্থিরতা, মেয়েদের বাল্যবিবাহ বাড়া এবং শিশুদের শ্রমে নামা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *